জাহিদুল হক আসিফঃ সাকিব আল হাসান বাংলাদেশের ক্রিকেটকেন্দ্রিক ধারণাই বদলে দিয়েছেন! বাংলাদেশের ক্রিকেটকে অন্তত ২৫ বছর এগিয়ে দেওয়ার একক কৃতিত্ব পাবেন সাকিব আল হাসান, বাংলাদেশের প্রথম এবং সত্যিকারের আইকন ক্রিকেটার। আইকন ক্রিকেটারের প্রভাব কতটা সুদূরবিস্তারী, শচীনের মাধ্যমে ভারত তা বুঝতে পেরেছে বহুদিন আগে। বাংলাদেশও বুঝতে শুরু করেছে, যার দৃশ্যমান ফলাফল পেতে আর অপেক্ষারও প্রয়োজন নেই।

মোহাম্মদ আশরাফুল, মাশরাফি বিন মুর্তজা বা সাকিব আল হাসান একেকজন যে সময়টাতে ক্রিকেট খেলতে শুরু করেছেন, তখন তাদের অনুসরণীয় ছিলেন হয়ত পাকিস্তান বা ভারতের কোনো ক্রিকেটার, ক্ষেত্রবিশেষে অস্ট্রেলিয়া, কিংবা ব্রায়ান লারা। কিন্তু ২০১০ এর পর থেকে যাদের ক্রিকেটে হাতেখড়ি তাদের আদর্শ খুঁজবার জন্য বাইরের দেশে তাকানোর প্রয়োজনই পড়ে না। কারণ, তাদের জন্য একজন সাকিব আল হাসান আছেন।
আশরাফুলের মতো রাজসিক অভিষেক তার ঘটেনি, মাশরাফির মতো গতির ঝড় তুলে শুরুতেই আলোচনায় আসেননি; বয়সভিত্তিক দলগুলোতে ভালো করার সুবাদে ক্রিকেট মহলে তার নামটা শোনা যেত একটুআধটু। কিন্তু এরকম সম্ভাবনাময় ক্রিকেটার তো প্রতি প্রজন্মেই বয়সভিত্তিক দলে থাকেন, যারা মূল দলে এসে প্রত্যাশা অনুযায়ী কিছুই করতে পারেন না বা পারেননি।

সাকিব আল হাসানের শুরুটাও হয়েছিল সেরকম। অলরাউন্ডার বলে শ্রুতি থাকলেও মোহাম্মদ রফিক আর আব্দুর রাজ্জাকের সঙ্গে তৃতীয় বাঁহাতি স্পিনার হিসেবে টুকটাক বোলিং করতেন, ব্যাটিং ছিল মূল কাজ। খেলায় স্ট্রোকের দ্যুতি বা ব্যাকরণসম্মত ব্যাটিং- দুটোরই অভাব। কিন্তু সুন্দর স্কুপ খেলেন, রানিং বিটুইন দ্য উইকেট চমৎকার, স্ট্রাইক রোটেটিং দক্ষতা- সবকিছুতেই অন্য বাংলাদেশী ব্যাটসম্যানদের সাথে সুস্পষ্ট পার্থক্য। এমনকি ফিল্ডিংয়েও শীর্ষস্থানীয় একজন।

ব্যাটসম্যান সাকিব আল হাসান বোলার হয়ে উঠেন নিউজিল্যান্ডের সাথে ঘরের মাঠে টেস্টে, দুই ইনিংস মিলিয়ে ১০ উইকেট নিয়ে। নিজের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে তিনি সচেতন। ক্রিকেট শেষ পর্যন্ত রান আর উইকেটেরই খেলা। তাই কতটা স্টাইল দেখিয়ে রান করা হলো, অথবা কতটা ভালো ডেলিভারিতে উইকেট পাওয়া হলো, স্কোরবোর্ডে তা লেখা থাকে না। কত রান-কত উইকেট- এটাই দিনশেষে পারফরম্যান্স।

বছরের পর বছর তিনি এই সাধারণ তত্ত্বটিই অনুসরণ করে যাচ্ছেন, নিজেকে নিয়ে গেছেন সমকালীন দেশী ক্রিকেটারদের চাইতে বহুদূরবর্তী উচ্চতায়। তিন ফরম্যাটের ক্রিকেট বাংলাদেশের একজন ক্রিকেটার কয়েক বছর ধরে শীর্ষ অলরাউন্ডার র‍্যাংকিংয়ে থাকবে, কাউন্টি ক্রিকেট, আইপিএল, বিগব্যাশ, সিপিএল, পিএসএল এর মতো বিশ্বময় আসরে খেলে বেড়াবে, মাত্র ৬-৭ বছর আগেও এ ধরনের কথা কেউ বললে তাকে নিশ্চিত পাগল অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হতো!

বিপিএলে খেলোয়াড় তৈরি করার জায়গা না সাকিব আল হাসান

সাকিব আল হাসান সূত্রে সিনেমা বা টেলিভিশন তারকাদের পাশাপাশি ক্রিকেটাররাও বিজ্ঞাপনের মডেল হয়েছেন। বিলবোর্ডগুলোতেও ক্রিকেটারদের ছবি, অর্থাৎ ক্রিকেট কমোডিটি বাড়ছে। ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানীগুলো ক্রিকেটের মাঝে প্রোডাক্ট পটেনশিয়ালিটি খুঁজে পেয়েছে। ব্র্যান্ড এম্বাসেডর হিসেবেও ক্রিকেটাররা প্রথম পছন্দ। মোবাইল কোম্পানীও দশ বছরে নিজেদের কীর্তি বুঝাতে সাকিব আল হাসানের বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার হওয়ার গল্প শুনিয়ে দেয়। ক্রিকেটখাতে এই যে বিনিয়োগ কারখানা তৈরির উপক্রম, তার সিংহভাগ কৃতিত্ব সাকিব আল হাসানের, এবং দল হিসেবে বাংলাদেশের সাফল্য।

মানুষ যতক্ষণ সাফল্য না পায় ততক্ষণই সাফল্যকে দুর্লভ বস্তু বলে মনে হয়, সাফল্যটা অভ্যাসে পরিণত হলে তখন ব্যাপৃত হয়। সাকিব আল হাসান আসার আগে কেউ কল্পনাও করেনি বাংলাদেশের কোনো ক্রিকেটার সারা বিশ্বে সমানতালে ক্রিকেট খেলবে; সেটা যেহেতু এখন প্রাত্যহিক ঘটনায় পর্যবসিত হয়েছে, ভবিষ্যতেও ক্রিকেটাররা হয়তোবা এর চাইতেও বড় লক্ষ্য নিয়ে ক্যারিয়ার শুরু করতে চাইবে। সেই সাহসটা দিয়েছেন সাকিব আল হাসান। অনেই তাকে আচরণে অস্ট্রেলিয়ান পেশাদারি মনোভাবের বলেন। জনপ্রিয়তার সাথে রয়েছে অনেক সমালোচনা। সমালোচিতও হয়েছেন বেশ কয়েকবার, এখনো রয়েছেন নিষেধাজ্ঞায়। কিন্তু এসব কোনোকিছুই তার মহিমাকে খর্ব করতে পারবেনা। সাকিব আল হাসান মানেই বাংলাদেশ ক্রিকেটের বৃহত্তম আত্মজীবনী।

আরও পড়ুন- ওয়ানডে ক্রিকেটে লাস্ট পাঁচ বছরে ওরা তিনজন

“খেলা সংক্রান্ত সকল সাম্প্রতিক খবর জানতে লাইক করুন আমাদের Facebook পেজ অথবা ফলো করুন Twitter আর সাবস্ক্রাইব করুন YouTube”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here