ইমরান খানকে স্ট্যাম্প দিয়ে পেটানো হল যেদিন, সফর বাতিল করে ফিরে গেল পাকিস্তান জাতীয় ক্রিকেট দল। দর্শকদের আক্রমণের ফলে বাংলাদেশের মাটিতে পরিত্যক্ত হওয়া প্রথম ম্যাচ এবং সফর বাতিলের ইতিহাস
শুরুতেই বলে দিচ্ছি, লেখার এই অংশটুকু অনেকের কাছেই “অপছন্দনীয়” অথবা “স্পর্শকাতর” লাগতে পারে। তবে লেখার স্বার্থে যেটুকু উল্লেখ করা দরকার আমি শুধুমাত্র সেই টুকুই লিখেছি এখানে।
১৯৮০ সালের জানুয়ারি মাসে দীর্ঘ ভারত সফরের মাঝে অল্প সময়ের জন্য বাংলাদেশ সফরে এসেছিল পাকিস্তান জাতীয় ক্রিকেট দল।১৯৭৯ সালের ১১ নভেম্বর ৬ টেস্টের লম্বা সিরিজ খেলার জন্য ভারতের মাটিতে পা রেখেছিল পাকিস্তান জাতীয় ক্রিকেট দল।
২১ নভেম্বর থেকে ৩০ ডিসেম্বর ১৯৭৯ পর্যন্ত প্রথম ৪ টেস্ট খেলে ০-১ ব্যবধানে পিছিয়ে থাকা পাকিস্তান ১ জানুয়ারি ১৯৮০ সালে ঢাকা বিমান বন্দরে অবতরণ করে।পাকিস্তান দলের অধিনায়ক ছিলেন আসিফ ইকবাল আর পাকিস্তান দলে ছিলেন তরুণ অল-রাউন্ডার ইমরান খান।
সংক্ষিপ্ত ওই সফরের শুরুতে ২-৩ জানুয়ারি চট্টগ্রামে বিসিসিবি নামের আদলে বাংলাদেশ জাতীয় দলের বিপক্ষে একটি ২-দিনের ম্যাচ খেলার পর ৫-৭ জানুয়ারি ঢাকা বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ জাতীয় দলের বিপক্ষে ৩-দিনের প্রথম শ্রেণীর ম্যাচ খেলার সূচী নির্ধারিত ছিল।
ঘটনার শুরু ১ জানুয়ারি ঢাকা বিমান বন্দরেই। পাকিস্তানের সুদর্শন অল-রাউন্ডার ইমরান খানকে দেখার জন্য গোলাপ ফুল হাতে একঝাঁক তরুণী বিমান বন্দরে উপস্থিত হয়েছিলেন। ইমরান খানের সাথে কথা বলার জন্যে এবং অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্যে বারবার ইমরান খানকে উদ্দেশ্য করে হাত নেড়ে মনযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টা চালাচ্ছিলেন ওই তরুণীরা।
কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য করে ইমরান খান অসৌজন্যমূলক আচরণ এবং বাজে ভঙ্গি প্রদর্শন করেন, পাশাপাশি কিছু বাজে মন্তব্যও করেছিলেন।
ক্রিকেট ইতিহাসবিদ এবং লেখক হাসান বাবলী ১৯৯৪ সালে তার লেখা বইয়ে উল্লেখ করেছেন-
“It is true that Imran Khan show some racist gestures to those Bangladeshi who were to receive them at airport and they were angry over the alleged bad and racist remarks by some Pak cricketers, mainly Imran Khan, about the independence of Bangladesh.”
উল্লেখ্য কতিপয় সাংবাদিক বিমান বন্দরের লবিতেই ইমরান খান এবং আরো কিছু পাকিস্তানি ক্রিকেটারকে বাংলাদেশ, বাংলাদেশের মানুষ এবং বাংলাদেশ ক্রিকেট নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন করলে পাকিস্তানি ক্রিকেটাররা অবজ্ঞাসূচক মন্তব্য করেছিলেন। যা পরেরদিন পত্রপত্রিকায় বড় করে ছাপানো হয়।
সম্পূরক তথ্য হিসেবে বলা উচিৎ এখানে যে,
ইমরান খান বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ব্যাপারে ভুল ধারণা পোষণ করতেন নিজের ভেতর। ইমরান খানের পুরো নাম “ইমরান আহমেদ খান নিয়াজী”, তিনি পাকিস্তানের “Pashtun Tribe”-এর “নিয়াজী” গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত যারা মূলত আফগানিস্তান থেকে এসেছিলেন পাকিস্তানে। অনেকেই বলে থাকেন কুখ্যাত পাকি জেনারেল আমির আব্দুল্লাহ খান নিয়াজীর ভাতিজা হন ইমরান খান, তবে এটা আসলে ভুল। জেনারেল নিয়াজীর সাথে ইমরান খানের সরাসরি কোন সম্পর্ক নেই তবে বৃহত্তর “নিয়াজী” গোত্রের সন্তান দুজনই এবং সেই সূত্রে লতায়-পাতায় তারা “চাচা-ভাতিজা”
তবে ইমরান খানের পরিবারের একাধিক উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা ছিলেন। ইমরানের আপন মামা লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ রাজা খান ১৯৬৯-১৯৭১ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ছিলেন এছাড়া ইমরানের আপন বড় খালার স্বামী জেনারেল ওয়াজিদ আলি খান বুর্কি ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তান আর্মির ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের প্রধান ছিলেন। ইমরানের আরেক মামা হচ্ছেন জেনারেল বিলাল ওমর খান এবং ইমরানের মাতৃকুলের আত্মীয় ছিলেন ১৯৭১ সালের আরেক কুখ্যাত জেনারেল জাহিদ আলী আকবর খান।
ফলে খুব স্বাভাবিক ঘটনা এই যে ইমরান খান তার পরিবারের কাছ থেকে ১৯৭১ সাল নিয়ে যা যা শুনেছেন তার সবই ছিল বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের বিপক্ষে চালানো পাকিস্তানি প্রোপাগান্ডা।
যাইহোক ইমরান খানের দেওয়া ওইসব বক্তব্য মানুষের মাঝে চরম বিরূপ প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয় যার প্রভাব পড়েছিল চট্টগ্রামেও।
৩ জানুয়ারি ২-দিনের ম্যাচের দ্বিতীয় দিনের চা-বিরতির পরপর একদল বিক্ষুব্ধ যুবক স্টেডিয়ামে প্রবেশ করে এবং দর্শকদের একাংশকে সাথে নিয়ে সরাসরি মাঠে প্রবেশ করে পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের বেদম প্রহার করা শুরু করে। একপর্যায়ে তারা ইমরান খানকে আলাদা করে নিয়ে স্ট্যাম্প দিয়ে পেটানো শুরু করে। শোনা যায় সাহায্যের জন্যে দায়িত্বরত একজন পুলিশের কাছে ইমরান সাহায্য চাইলে ওই পুলিশ সদস্য উল্টো ইমরান খানের দিকে রাইফেল উঁচিয়ে ধরেন!
এই ঘটনার পর ম্যাচ পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয় এবং পাকিস্তান দল সরাসরি ভারতে চলে যায় ঢাকার ম্যাচ বাতিল করে।
এই ঘটনার পর বাংলাদেশ-পাকিস্তান ক্রিকেটীয় সম্পর্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ১৯৯৪ সালের আগে পাকিস্তান জাতীয় ক্রিকেট দল আর বাংলাদেশ সফরে যায়নি।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ এবং মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ সম্পর্কে ইমরান খানের ধারনা অনেকটাই বদলে দিয়েছিলেন বলে দাবি করেন সৈয়দ আশরাফুল হক। সৈয়দ আশরাফ যখন লন্ডনে ছিলেন ইমরান খানও তখন লন্ডনে পড়াশুনা করছিলেন। একসময় তাদের মাঝে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠে আর তখনই ইমরান খানকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে সঠিক ইতিহাস জানাতে চেষ্টা চালান সৈয়দ আশরাফুল হক।

 আরও পড়ুন: তামিমের লাইভ শো’তে আসছেন কিংবাদন্তী ওয়াসিম আকরাম!

“খেলা সংক্রান্ত সকল সাম্প্রতিক খবর জানতে লাইক করুন আমাদের Facebook পেজ অথবা ফলো করুন Twitter আর সাবস্ক্রাইব করুন YouTube”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here